সাত ‘শিক্ষাবীরের’ স্কুলযাত্রা




শ্রেণিকক্ষে শিশু শিক্ষার্থীদের সঙ্গে চল্লিশোর্ধ্ব শিক্ষার্থীরা। দিনাজপুরের নবাবগঞ্জ উপজেলার মাহমুদপুর সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয় থেকে গত বৃহস্পতিবার তোলা ছবি l প্রথম আলোস্কুলের নাম মাহমুদপুর সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয়। বিদ্যালয়ের শিক্ষার্থীরা দাঁড়িয়েছে শরীরচর্চার লাইনে। শিক্ষার্থীদের মধ্যে চোখে পড়ল চল্লিশোর্ধ্ব সাত ব্যক্তি। প্রথমে ভাবলাম হয়তো তাঁদের সন্তান বা নাতিদের স্কুলে পৌঁছে দিতে এসেছেন। কিন্তু শিক্ষার্থীদের সঙ্গে লাইনে কেন? কাছে গিয়ে দেখলাম, শিক্ষার্থীদের সঙ্গে জাতীয় সংগীতও গাইছেন তাঁরা।

এখানেই শেষ নয়। শরীরচর্চা শেষে শিক্ষার্থীদের সঙ্গে ওই সাত ব্যক্তি লাইন ধরে প্রথম শ্রেণির ক্লাসে গিয়ে বসলেন। এরপর শিক্ষক ব্ল্যাকবোর্ডে যেভাবে অ, আ লিখছেন, সেভাবেই তাঁরা মনোযোগ দিয়ে হাতের লেখা লিখছেন।


জানতে চাইলে বিদ্যালয়ের প্রধান শিক্ষক মো. জেনাজুল হায়দার জানান, মাহমুদপুর ইউনিয়নের মোগড়পাড়া গ্রামের আবদুল লতিফ (৪৫), আমবাগান গ্রামের বদিউজ্জামান (৬৫), মাহমুদপুর গ্রামের আছাদুল ইসলাম (৬৫), মোগড়পাড়া গ্রামের লাল মিয়া (৪৫), শাহিনুর আলম (৪৭), আবগানের বাদশা মিয়া (৫৩) এবং দত্তপাড়ার মো. সিদ্দিক মিয়া (৬০) লেখাপড়া শেখার জন্য এ বছর ১ জানুয়ারি বিদ্যালয়ে ভর্তি হয়েছেন।


কথা বলে জানা গেল, কোনো আলোচনা-সমালোচনার পরোয়া না
করে বীরের মতোই স্কুলে যাচ্ছেন তাঁরা।


আবদুল লতিফ জানান, এ বয়সে এসে কোরআন শেখা শুরু করেছেন। কিন্তু বাংলা পড়তে না জানায় কোরআনের তরজমা পড়তে পারছেন না। এতে করে তৃপ্তি মিলছে না।


বদিউজ্জামান (৬৮) জানান, বিভিন্ন কারণে ছোটবেলায় লেখাপড়া শেখার সুযোগ হয়নি। লেখাপড়া না জানায় বর্তমানে নানা কাজে ভোগান্তির শিকার হচ্ছেন।


ক্লাস শেষে মো. লাল মিয়া প্রথম আলোকে বলেন, ‘ছোট বেলাত খাওন-দাওনের টাকাই আছোলোন। বুদ্ধি হবার থেকে কাম করবা লাগছি। কেঙ্কেরে লেখাপড়া করমো। এখন তো আর হচেনা। তাই স্কুলোত ভর্তি হনো।’


মো. সিদ্দিক মিয়া বলেন, ‘হামার তিন মেয়ে। এটা টাইটেল পাস, এটা ইন্টারমেডিয়েট আর এটা এসএসসি। এটা ছোল এসএসসি পাস আর এটা স্কুকোলোত পড়ছে। ছলপোলগুলার ভালো ভালো জাগাত থেকে বিয়ার ঘর আওছে। নিজে লেখাপড়া না জানায় সমস্যা হছে।’


 বাদশা মিয়ার স্ত্রী মনোয়ারা বেগম প্রথম আলোকে জানান, ‘বাড়ির লোক ভর্তি হইছে হারা খুব খুশি। এই যুগোত লেখাপড়া না জানলে হয় কও। হামরাও লেখাপড়া জানি না। বাড়ির লোকের কাছ থেকে হামরাও রাতোত লেখা শেখোছি।’


হারুন উর রশীদের ছেলে মোগড়পাড়া উচ্চবিদ্যালয়ের সপ্তম শ্রেণির শিক্ষার্থী আবদুল কাইয়ুম প্রথম আলোকে বলেছে, ‘আমরা তিন ভাই, দুই বোন। সবাই লেখাপড়া করি। বাবা-মা কেউ লেখাপড়া জানে না। এটা নিয়ে আমাদের খারাপ লাগত। বাবা স্কুলে ভর্তি হওয়ায় খুব খুশি হয়েছি। প্রতিদিন রাতে বাবা আমাদের কাছে পড়া শিখে নেয়। খুব ভালো লাগে।’


ছোট শিশুদের সঙ্গে ক্লাস করতে সমস্যা হচ্ছে কি না জানতে চাইলে বয়স্ক এই শিক্ষার্থীরা জানান, সকলেই নাতির বয়সে। পাড়া প্রতিবেশী। তাই কোনো সমস্যা হচ্ছে না।


সহকারী শিক্ষক মো. এরশাদুল হক প্রথম আলোকে জানান, ওই সাত ব্যক্তি নিয়মিত ক্লাসে আসেন। প্রথম দু-এক দিন কিছুটা অস্বস্তি হলেও ক্লাসের এখন সবাই স্বাভাবিক।


বিদ্যালয়ের প্রধান শিক্ষক মো. জেনাজুল হায়দার প্রথম আলোকে জানান, ওই সাত ব্যক্তি এলাকায় দৃষ্টান্ত স্থাপন করেছেন। বিষয়টি এলাকার লেখাপড়া না জানা অন্য ব্যক্তিদের মাঝে সাড়া ফেলেছে।


জানতে চাইলে নবাবগঞ্জ প্রাথমিক শিক্ষা কার্যালয়ের দায়িত্বপ্রাপ্ত কর্মকর্তা মো. শরিফ হোসেন প্রথম আলোকে জানান, বিষয়টি খুবই উৎসাহব্যঞ্জক। ওই শিক্ষার্থীদের বিষয়ে সব সময় খোঁজখবর রাখা হচ্ছে। শিক্ষা কার্যালয় থেকে সর্বাত্মক সহযোগিতা অব্যাহত থাকবে।


উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তা (ইউএনও) মো. বজলুর রশীদ জানান, ওই সাত ব্যক্তি এলাকায় একটি দৃষ্টান্ত স্থাপন করেছেন। তাঁদের দেখে উদ্বুদ্ধ হয়ে লেখাপড়া না জানা অনেকেই নতুন করে লেখাপড়া শেখার আগ্রহ দেখাচ্ছেন। নবাবগঞ্জে বিভিন্ন এলাকায় বয়স্ক শিক্ষা কার্যক্রম চালুর বিষয়ে তিনি স্থানীয় সাংসদ এবং জেলা প্রশাসকের সঙ্গে কথা বলেছেন।




Share on Google Plus

About WARAJ

    Blogger Comment
    Facebook Comment

0 comments:

Post a Comment