
নারায়ণগঞ্জ সিটি করপোরেশনের সাবেক দু’জন কাউন্সিলর নূর হোসেন ও নজরুল ইসলামের মধ্যকার বিরোধ ও দ্বন্দ্বেই সেভেন মার্ডারের ঘটনা ঘটেছে। আর এখানে ‘সুশৃঙ্খল’ বাহিনী র্যাবের উচ্চাভিলাষী কয়েকজন জনতার সাথে মিশে ঘৃণ্যভাবে হত্যাকাণ্ডের ঘটনাগুলো ঘটিয়েছেন যেখানে শুধুমাত্র নজরুল একক টার্গেট থাকলেও প্রাণ হারাতে হয়েছে নিরীহ ছয়জনকে। ভবিষ্যতে এ ধরনের কর্মকর্তাদের নিয়োগে আরো সতর্কতা অবলম্বন করা প্রয়োজন বলে মনে করেন আদালত।
নারায়ণগঞ্জের আলোচিত সেভেন মার্ডার মামলার পর্যালোচনায় বিচারক এসব উল্লেখ করেছেন বলে জানিয়েছেন জেলা আদালতের পাবলিক প্রসিকিউটর (পিপি) অ্যাডভোকেট ওয়াজেদ আলী খোকন।
আজ রোববার দুপুরে তিনি সংবাদ সম্মেলনে এ তথ্য জানান।
এদিন সেভেন মার্ডারের দুটি মামলার রায় হাইকোর্টে পাঠানো হয়। ১৬৩ পাতা করে প্রতিটি মামলার রায়ে রয়েছে ১১ হাজার করে লাইন। গত ১৬ জানুয়ারি সাত খুন মামলার রায় দেন নারায়ণগঞ্জ জেলা ও দায়রা জজ সৈয়দ এনায়েত হোসেন। তিনি ২৬ জনকে মৃত্যুদন্ড ও ৯ জনকে বিভিন্ন মেয়াদে কারাদন্ড প্রদান করেন।
আজ রোববার বেলা দেড়টার দিকে নারায়ণগঞ্জ জেলা জজ আদালতের প্রশাসনিক কর্মকর্তা আবদুল খালেক ও নাজির আবদুল বাতেন মোড়লের নেতৃত্বে আট সদস্যের একটি দল কঠোর পুলিশ প্রহরায় মামলার সংশ্লিষ্ট নথি হাইকোর্টে দাখিল করতে রওনা দেন।
পিপি বলেন, সেভেন মার্ডার মামলার রায় সর্বকালের সর্বোচ্চ সাজার একটি। চাঞ্চল্যকর এ মামলার প্রত্যাশিত রায় হয়েছে। এখন এ মামলার রায়, জুডিশিয়াল রেকর্ড উচ্চ আদালতে পাঠানো হয়েছে। ডেথ রেফারেন্সে শুনানী হবে। রাষ্ট্রপক্ষ আশা করছে নিম্ন আদালতের রায় হাইকোর্টেও বহাল থাকবে।
পিপি আরো জানান, সেভেন মার্ডারের ঘটনায় দুটি মামলা দায়ের করা হয়। একটি মামলার বাদী সেলিনা ইসলাম বিউটি। এ মামলার ভিকটিম ছিলেন পাঁচজন। অপর মামলার বাদী নিহত অ্যাডভোকেট চন্দন সরকারের জামাতা বিজয় কুমার পাল। এ মামলায় ভিকটিম ছিলেন দুইজন। দুটি মামলার রায় আলাদা আলাদা ঘোষণা করা হয়েছে এবং দুটি মামলায় অনুরূপ সাজা ভোগ করতে হবে। একই দিন থেকে সাজা ভোগ শুরু হবে। যারা পলাতক (১২ জন) আছেন তারা যেদিন আত্মসমর্পন করবেন বা গ্রেফতার হবেন সেদিন থেকেই সাজা শুরু হবে।
নারায়ণগঞ্জে সেভেন মার্ডার মামলার রায়ের পর্যবেক্ষণে আদালত বলেছেন, ‘একটি শৃঙ্খল বাহিনীর কিছু সদস্য দুস্কৃতিকারী এবং রাজনৈতিক সন্ত্রাসীদের হয়ে কাজ করেছেন। এখানে নূর হোসেন একজন চিহ্নিত সন্ত্রাসী, ভূমিদুস্য। অপরজন (নজরুল) সন্ত্রাসী পরিচিতি লাভ করেছেন। সিটি করপোরেশনের সাবেক এই দু’জন কাউন্সিলরের মধ্যকার বিরোধ ও দ্বন্দ্বেই সেভেন মার্ডারের ঘটনা ঘটেছে। দুজনেই সন্ত্রাসী ছিলেন, দুজনের ছিল বিশাল বাহিনী। দুজনেই এলাকায় প্রভাব বিস্তার নিয়ে দ্বন্দ্বে জড়িয়ে পড়েন। নূর হোসেনের প্রধান টার্গেট ছিল নজরুল। কিন্তু এখানে একজন তথা নজরুলকে হত্যা করতে গিয়ে নূর হোসেন বাহিনী ও র্যাব সদস্যদের দ্বারা নির্মম হত্যাকাণ্ডের শিকার হতে হয়েছে নিরীহ ছয়জনকে।’
পর্যালোচনায় বলা হয়েছে, ‘র্যাব একটি সুশৃঙ্খল বাহিনী। দেশের ক্রান্তিলগ্ন থেকে শুরু করে জঙ্গি দমন, সন্ত্রাস দমন, মাদক নির্মূল এসব কাজে র্যাবের গৌরবোজ্জ্বল ভূমিকা রয়েছে। র্যাব একটি প্রশংসিত বাহিনী। র্যাবের উচ্চাভিলাষী কয়েকজন কর্মকর্তার কারণে পাবলিকের সাথে মিশে এ হত্যাকাণ্ডের ঘটনাটি ঘটানো হয়েছে। এর দায় পুরো বাহিনীর উপর বর্তায় না। যারা ঘটিয়েছেন তাদের উপর দায় বর্তাবে। এর পেছনে তাদের ব্যক্তিগত লোভ লালসা, উচ্চাভিলাষী মনোভাব কাজ করেছে। এ সেভেন মার্ডারের ঘটনায় র্যাবের সামাজিক মর্যাদা কিছুটা নষ্ট হলেও সামগ্রিক সুনাম ক্ষুণ্ণ হয়নি।’
পিপি আরো জানান, বিচারক রায়ের পর্যালোচনায় র্যাবের যেমন প্রশংসা করেছেন তেমনি কিছুটা তিরস্কারও করেছেন। ভবিষ্যতে র্যাব বাহিনীতে এ ধরনের ব্যক্তি লোভ লালসায় কেউ যেন কোনো ঘৃণ্য কাজ করতে না পারে সেজন্য সতর্ক থাকতে হবে। তিরস্কার মানে ভবিষ্যতে যাতে এ বাহিনীতে নিয়োগের ক্ষেত্রে আরো সতর্কতা অবলম্বন করা হয়। তাছাড়া যারা আছেন তারাও যেন সতর্ক হয়ে যান। বিচারক এটাকেই তিরস্কার হিসেবে আখ্যায়িত করেছেন।
পিপি জানান, ঘটনার দিন (২০১৪ সালের ২৭ এপ্রিল) অপহরণের পর র্যাব জানায় যে সেটা লিগ্যাল অর্ডার ছিল। কিন্তু আমরা রাষ্ট্রপক্ষ বলছি কাউকে আটকের ২৪ ঘণ্টার মধ্যে সংশ্লিষ্ট থানায় সোপর্দ করতে হবে তাহলেই সেটা লিগ্যাল অর্ডার হবে। কিন্তু র্যাবের কতিপয় সদস্য সাতজনকে অপহরণ করে হত্যার পর লাশ নদীতে ফেলে দিয়ে লাশ গুম করেছে। এসব ঘটনায় ৩৫ জন জড়িত ছিলেন। এরা অপহরণ, হত্যা ও লাশ গুমে প্রত্যক্ষভাবে জড়িত ছিল, কোনোভাবেই বিচ্ছিন্ন হয়নি। তাদের মধ্যে ২৬ জন সরাসরি হত্যা, সাতজন অপহরণ ও অপর দুইজন আলামত নষ্ট করেছে।
পিপি আরো জানান, অপহরণ থেকে শুরু করে হত্যাকাণ্ডে জড়িত থাকার প্রমাণ থাকায় আদালত ২৬ জনকে মৃত্যুদণ্ড দিয়েছেন। আর অপহরণে সহযোগিতায় সাতজনকে ১০ বছর করে কারাদণ্ড ও ৫০ হাজার টাকা অর্থদণ্ড এবং সাত বছরে করে দণ্ডপ্রাপ্তদের ২৫ হাজার টাকা করে অর্থদণ্ড করা হয়।
উল্লেখ্য, ২০১৪ সালের ২৭ এপ্রিল ঢাকা-নারায়ণগঞ্জ লিংক রোড থেকে নারায়ণগঞ্জ সিটি করপোরেশনের কাউন্সিলর ও প্যানেল মেয়র নজরুল ইসলাম, আইনজীবী চন্দন সরকারসহ সাতজনকে অপহরণ করা হয়। এর তিন দিনপর ৩০ এপ্রিল শীতলক্ষ্যা নদীতে ভেসে ওঠে ছয়জনের লাশ। পরদিন আরো একজনের লাশ ভেসে ওঠে নদীতে। নজরুল ইসলাম ও চন্দন সরকার ছাড়া বাকি নিহতরা হলেন- নজরুলের বন্ধু মনিরুজ্জামান স্বপন, তাজুল ইসলাম, লিটন, গাড়িচালক জাহাঙ্গীর আলম ও চন্দন সরকারের গাড়িচালক মো. ইব্রাহীম। এরপর স্বজনরা লাশগুলো শনাক্ত করেন।
নারায়ণগঞ্জের ইতিহাসে তো বটেই, দেশের ইতিহাসেও এটি একটি ন্যাক্কারজনক ঘটনা। কলংকিত করা হয় নারায়ণগঞ্জবাসীকে। মারাত্মক প্রশ্নবিদ্ধ হয় আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীর এলিট ফোর্স র্যাব। সাতজনকে অপহরণের ঘটনা এখনো ভুলতে পারেনি রাজধানী লগোয়া শীতলক্ষ্যার তীরের মানুষ। ঘটনার পর র্যাবের তিন কর্মকর্তাকে গ্রেফতার, প্রধান আসামী নূর হোসেনকে ভারত থেকে দেশে ফিরিয়ে আনাসহ টান টান উত্তেজনায় পার হয়ে গেছে পৌনে তিন বছর।
এ অবস্থায় ১৬ জানুয়ারি সকালেই ঘোষণা করা হয় রায়। এ রায় ঘিরে সকাল থেকে নারায়ণগঞ্জের জেলা ও দায়রা জজ আদালত প্রাঙ্গণ ও আশপাশের এলাকায় নেয়া হয় কঠোর নিরাপত্তা। সকাল ৯টায় নারায়ণগঞ্জ কারাগার থেকে ১৮ জন ও কাশিমপুর কারাগার থেকে পৌনে ১০টায় বাকি পাঁচজনকে নারায়ণগঞ্জ জেলা ও দায়রা জজ সৈয়দ এনায়েত হোসেনের আদালতে হাজির করা হয়। সকাল ১০টা ৪ মিনিট হতে ১০টা ৯ মিনিট পর্যন্ত বিচারক রায়ে ২৬ জনের ফাঁসি ও নয়জনের বিভিন্ন মেয়াদে কারাদণ্ড প্রদান করেন। সেভেন মার্ডারের ঘটনায় দুটি মামলা হলেও বিচার চলে একসাথে। বিচারক একটি মামলা হিসেবে বিবেচনা করেই রায় ঘোষণা করেন।
আসামিদের অপরাধের বিশ্লেষণ ও পর্যবেক্ষণ অংশ বাদ দিয়ে কেবল সাজার অংশটি মাত্রা কয়েক মিনিটের মধ্যে পড়ে শোনান বিচারক। গ্রেফতার ২৩ আসামীর সবাই আদালতে উপস্থিত ছিলেন। গত বছরের ৩০ নভেম্বর রায় ঘোষণার দিন নির্ধারণ করেন আদালত।
মৃত্যুদণ্ডপ্রাপ্ত ২৬ জন
মৃত্যুদণ্ডপ্রাপ্ত আসামীরা হলেন- গ্রেফতার থাকা প্রধান আসামী নূর হোসেন, র্যাবের চাকরিচ্যুত কর্মকর্তা লেফটেন্যান্ট কর্নেল তারেক সাঈদ মোহাম্মদ, মেজর আরিফ হোসেন, লেফটেন্যান্ট কমান্ডার মাসুদ রানা (এমএম রানা), হাবিলদার এমদাদুল হক, আরোজি-১ আরিফ হোসেন, ল্যান্স নায়েক হীরা মিয়া, ল্যান্স নায়েক বেলাল হোসেন, সিপাহী আবু তৈয়্যব, কনস্টেবল মো: শিহাব উদ্দিন, এসআই পুর্নেন্দ বালা, র্যাবের সদস্য আসাদুজ্জামান নূর, আলী মোহাম্মদ, মিজানুর রহমান দিপু, রহম আলী, আবুল বাশার, নূর হোসেনের সহযোগী মোর্তুজা জামান চার্চিল। পলাতক- নূর হোসেনের সহযোগি সেলিম, সানাউল্লাহ সানা, শাহজাহান, জামালউদ্দিন, সৈনিক আবদুল আলীম, সৈনিক মহিউদ্দিন মুন্সী, আলামিন শরিফ, তাজুল ইসলাম, এনামুল কবীর।
বিভিন্ন মেয়াদে কারাদণ্ড নয়জনের
অপহরণের অভিযোগ প্রমাণিত হওয়ায় গ্রেফতার আসামিদের মধ্যে করপোরাল রুহুল আমিনের ১০ বছর, এএসআই বজলুর রহমানের সাত বছর, হাবিলদার নাসির উদ্দিনের সাত বছর, এএসআই আবুল কালাম আজাদের ১০ বছর, সৈনিক নুরুজ্জামানের ১০ বছর, কনস্টেবল বাবুল হাসানের ১০ বছর কারাদন্ডণ্ড হয়েছে। পলাতক আসামিদের মধ্যে হাবিবুর রহমানের ১৭ বছর, কামাল হোসেনের ১০ বছর ও মোখলেসুর রহমানের ১০ বছর কারাদণ্ড হয়েছে।
0 comments:
Post a Comment