
সময়মতো আন্দোলন করে বিএনপি আবারো ক্ষমতায় আসবে বলে নতুন বছরের শুরুতে প্রত্যয় ব্যক্ত করেছেন দলের চেয়ারপারসন বেগম খালেদা জিয়া।
তিনি বলেছেন, এরশাদবিরোধী আন্দোলন করেছি, আমি তোমাদের সাথে রাজপথে ছিলাম। এই বিএনপিকে তিনবার ক্ষমতায় এনেছি। ইনশা আল্লাহ দলকে সুন্দর করে গুছিয়ে, যেখানে কোনো গ্রপিং-লবিং থাকবে না, যারা উপযুক্ত যোগ্য তাদেরকে নেতৃত্ব দিয়ে সময়মতো আন্দোলন করে বিএনপি আবার ক্ষমতায় আসবে।
জাতীয়তাবাদী ছাত্রদলের ৩৮তম প্রতিষ্ঠাবার্ষিকী উপলক্ষে রাজধানীর ইঞ্জিনিয়ার্স ইনস্টিটিউশনে এক ছাত্র সমাবেশে প্রধান অতিথির বক্তব্যে খালেদা জিয়া একথা বলেন।
মুক্তিযুদ্ধে জিয়াউর রহমানের অবদানের কথা তুলে ধরতে গিয়ে বিএনপি চেয়ারপারসন বলেন, স্বাধীনতার ঘোষণাটা কে দিয়েছিল? শহীদ জিয়াউর রহমান। কিন্তু শহীদ জিয়াউর রহমানের তো এ কাজ ছিল না, এটা তার দায়িত্ব ছিল না। যারা তখন পলিটিশিয়ান ছিলেন, যারা তখন ক্ষমতার জন্য বারগেইনিং করছিলেন, তাদের দায়িত্ব ছিল এটি। যখন এই বার্গেইনিংয়ে হচ্ছে না, যখন সৈন্যের পর সৈন্য এনে এই দেশের ওপর পাকিস্তানীরা আক্রমণ করেছে, পিলখানা আক্রমণ করেছে, মানুষ হত্যা করছে, তখন তাদের (আওয়ামী লীগের) নেতাদের কাছে গিয়ে অনেকে অনুরোধ করেছে, কাকুনি মিনতি করেছে, তারপরও স্বাধীনতার ঘোষণাটা কিন্তু তারা দেন নাই।
বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমানের নাম না নিয়েই খালেদা জিয়া বলেন, তিনি চেয়েছিলেন পাকিস্তানের প্রধানমন্ত্রী হতে। তিনি বাংলাদেশের প্রধানমন্ত্রী হতে চান নাই। যত মানুষ শুনেছে, এমনকি তাদের নেতারা পর্যন্ত শুনেছে জিয়াউর রহমান ঘোষণা দিয়েছে স্বাধীনতার। তিনি আহ্বান করেছেন। তার ডাকে সাড়া দিয়ে মানুষ যুদ্ধে অংশগ্রহণ করেছে।
খালেদা জিয়া বলেন, আমার বিরুদ্ধে একটার পর একটা মামলাতো আছেই। কিন্তু আমি এসবের পরোয়া করি না।
বর্তমান সরকার জিয়াউর রহমানের বদনাম করছে অভিযোগ করে খালেদা জিয়া বলেন, মিথ্যা প্রচারণা চলছে জিয়াউর রহমান সম্পর্কে। যত ইচ্ছা তারা মিথ্যা বলুক, আমার কোনো সমস্যা নেই। মানুষই বুঝবে এরা কতটা নিচু, কতটা নোংরা আর কী প্রকৃতির লোক। এর ফলে মানুষ তাদেরকে আরো দূরে ঠেলে দেবে।
খালেদা জিয়া অভিযোগ করেন, এ সরকারের আমলে দেশে হত্যা ও গুমের মহোৎসব শুরু হয়েছে। আর চলছে বিএনপি ও ছাত্রদল নেতাকর্মীদের ওপর অমানবিক নির্যাতন।
গাইবান্ধা-১ আসনের সরকার দলীয় সংসদ সদস্য মঞ্জুরুল ইসলাম লিটন হত্যাকাণ্ডের দিকে ইঙ্গিত করে বিএনপির চেয়ারপারসন বলেন, বিএনপি-আওয়ামী লীগ বুঝি না, হত্যাকাণ্ড বন্ধ করতে হবে।
তিনি বলেন, কে মরলো সেটি বড় কথা নয়। সব মৃত্যুই কষ্ট দেয়। নতুন বছরের প্রথম দিনটি ভালো সংবাদ শুনতে চেয়েছিলাম। কিন্তু আজ খবরের কাগজে কি দেখলাম। নিয়ম-নীতির তোয়াক্কা না করে সরকার অস্ত্র কিনছে বলেও অভিযোগ করেছেন তিনি।
খালেদা জিয়া বলেন, ক্ষমতা চিরস্থায়ী করতে, বংশধরদের কাছে ক্ষমতা তুলে দিতে এই অবৈধ সরকার একের পর এক আইন করছে। স্বৈরাচারী সরকার দেশটাকে পরিকল্পিতভাবে ধ্বংস করছে। জোর করে বেশিদিন ক্ষমতায় টিকে থাকা যায় না উল্লেখ করে খালেদা জিয়া বলেন, সুষ্ঠু নির্বাচনের জন্য শুধু নির্বাচন কমিশন নিরপেক্ষ হলেই চলবে না, প্রয়োজন নির্বাচনকালীন একটি নিরপেক্ষ সহায়ক সরকার।
ছাত্রদলের নেতাদের শুধু জিয়া, খালেদা, বা তারেক রহমানের শ্লোগান না দিয়ে দেশের সঙ্কটময় নানা বিষয়ে শ্লোগান তোলার আহবান জানান খালেদা জিয়া।
ছাত্রনেতাদের উদ্দেশে তিনি বলেন, স্বৈরাচারী সরকার হাজারো অপকর্ম করছে, টাকা পাচার করছে এসবের বিরুদ্ধে স্লোগান তুলতে হবে। শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানে যে অরাজকতা চলছে, তার বিরুদ্ধে কথা বলতে হবে। বিএনপির বিরুদ্ধে তারা যে ষড়যন্ত্র করছে, তা ঠেকাতে হবে। মুক্তিযুদ্ধে যেমন তরুনরা ঝাপিয়ে পরেছিল, তেমনি তোমাদেরও সন্ত্রাসের বিরুদ্ধে সোচ্চার হতে হবে।
বিশেষ অতিথির বক্তব্যে বিএনপির মহাসচিব মির্জা ফখরুল ইসলাম আলমগীর বলেন, আজকে যারা বিএনপির নেতৃত্ব দিচ্ছেন তারা বেশিরভাগই ছাত্রদলের নেতা। ভবিষ্যতে এরাই দলের কর্ণধার হিসেবে আবির্ভূত হবেন।
তিনি বলেন, বাংলাদেশের ছাত্র আন্দোলনের ইতিহাস, অত্যন্ত গৌরবময় ইতিহাস। ৫২’র ভাষা আন্দোলন, নব্বইয়ের গণঅভ্যুত্থানসহ বাংলাদেশের সব আন্দোলনেই ছিল ছাত্রদের গৌরবময় ভূমিকা।
ছাত্রদলের ত্যাগ বৃথা যাবে না উল্লেখ করে মির্জা ফখরুল বলেন, সম্প্রতি বিভিন্ন আন্দোলনে অনেক ছাত্রনেতা আহত হয়েছেন, পঙ্গু হয়েছেন, কারাবরণ করেছেন। তাদের এ ত্যাগ বৃথা যাবে না। খালেদা জিয়ার নেতৃত্বে দেশ পুনর্গঠনের কাজে এ ছাত্রনেতাদের সম্পৃক্ত করা হবে।
দেশ ধ্বংসের দ্বারপ্রান্তে পৌঁছে গেছে উল্লেখ করে তিনি বলেন, কোনো কিছু আর অবশিষ্ট নেই। খালেদা জিয়ার নেতৃত্বে আবার ঘুরে দাঁড়াতে হবে। দেশকে বাঁচাতে হবে। দেশ নিয়ে জিয়াউর রহমান যে স্বপ্ন দেখেছিলেন, তা বাস্তবায়ন করতে হবে।
জাতীয় পার্টির চেয়ারম্যান হুসেইন মুহম্মদ এরশাদের সমালোচনা করে ফখরুল বলেন, জাতীয় পাটির্র সমাবেশ ছিল আজ। সেখানে হুসেইন মুহম্মদ এরশাদ বক্তব্য দিয়েছেন। তিনি আরো বাঁচতে চান বলেছেন। এজন্য তাকে রাষ্ট্রপতি বানাতে হবে, প্রধানমন্ত্রী বানাতে হবে। নইলে তিনি বাঁচবেন না।
ফখরুল বলেন, এ ধরনের একজন লোককে দূত বানিয়েছেন শেখ হাসিনা। তার দলকে বিরোধীদলের মর্যাদা দিয়েছেন। তার উপর আস্থা রেখেছেন তিনি (হাসিনা)। কিন্তু জনগণের আস্থা বিএনপির চেয়ারপারসন খালেদা জিয়ার প্রতি। তার নেতৃত্বে ঐক্যবদ্ধ আন্দোলনের মধ্য দিয়ে স্বৈরাচার ও অত্যাচারী সরকারের পতন হবে। ২০১৭ সাল হবে জনগণের।
ছাত্রদল সভাপতি রাজিব আহসানের সভাপতিত্বে ও সাধারণ সম্পাদক আকরামুল হাসানের সঞ্চালনায় সমাবেশে উপস্থিত ছিলেন বিএনপির স্থায়ী কমিটির সদস্য ব্যারিস্টার মওদুদ আহমদ, ড. আব্দুল মঈন খান, ভাইস চেয়ারম্যান শামসুজ্জামান দুদু, ডা: এজেডএম জাহিদ হোসেন, চেয়ারপারসনের উপদেষ্টা আমান উল্লাহ আমান, আবুল খায়ের ভূঁইয়া, ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের অধ্যাপক ড. সুকোমল বড়ুয়া, আতাউর রহমান ঢালী, কেন্দ্রীয় নেতা সৈয়দ মোয়াজ্জেম হোসেন আলাল, খায়রুল কবির খোকন, ড. আসাদুজ্জামান রিপন, ফজলুল হক মিলন, রুহুল কুদ্দুস তালুকদার দুলু, বিলকিস জাহান শিরিন, শহিদ উদ্দিন চৌধুরী এ্যানী, এবিএম মোশারফ হোসেন, আজিজুল বারী হেলাল, শহিদুল ইসলাম বাবুল, সেলিমুজ্জামান সেলিম, মীর সরফত আলী সপু, শিরিন সুলতানা, রাশেদা বেগম হীরা, সুলতান সালাহউদ্দিন টুকু, শাম্মী আখতার, নিলোফার চৌধুরী মনি, তাইফুল ইসলাম টিপু, অ্যাডভোকেট রফিক সিকদার, আমিনুল হক, আবু বকর সিদ্দিক, অঙ্গ সংগঠনের নেতাদের মধ্যে শফিউল বারী বাবু, আব্দুল কাদের ভুইয়া জুয়েল, আনোয়ার হোসাইন, সুলতানা আহম্মেদ, ছাত্রদলের সাবেক নেতা হাবিবুর রশিদ হাবিব, ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের অধ্যাপক ড. এবিএম ওবায়দুল ইসলাম, ড. লুৎফর রহমান খান প্রমুখ।
ছাত্রদলের ৩৮তম প্রতিষ্ঠাবার্ষিকী উপলক্ষে রাজধানীর ইঞ্জিনিয়ার্স ইনস্টিটিউশনের ভেতরে-বাইরে সাজানো হয় বর্ণিল সাজে।
অনুষ্ঠানে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়, জাহাঙ্গীরনগর বিশ্ববিদ্যালয়, জগন্নাথ বিশ্ববিদ্যালয়, ঢাকা কলেজ, তেজগাঁও, তিতুমির, মিরপুর বাংলা কলেজ, বেসরকারি বিশ্ববিদ্যালয়সহ ঢাকা মহানগরীর বিভিন্ন থানা এবং ওয়ার্ডের শত শত নেতাকর্মী খণ্ড খণ্ড মিছিল নিয়ে ছাত্রসমাবেশে যোগ দেন। তারা শহীদ প্রেসিডেন্ট জিয়াউর রহমান, খালেদা জিয়া ও তারেক রহমানের নামে স্লোগান দিতে থাকেন। ইঞ্জিনিয়ার্স ইনস্টিটিউশন প্রাঙ্গণে নেতাকর্মীরা ব্যাপক মহড়া দেন।
বিকেল সাড়ে চারটার দিকে বেগম খালেদা জিয়া সভাস্থলে পৌঁছলে তিনি জাতীয় ও দলীয় পতাকা উত্তোলন এবং পায়রা উড়িয়ে ছাত্র সমাবেশের উদ্বোধন করেন।
সমাবেশের শুরুতে শোক প্রস্তাব উপস্থাপন করেন ছাত্রদলের সিনিয়র সহসভাপতি মামুনুর রশিদ ও সাংগঠনিক রিপোর্ট পেশ করেন সাংগঠনিক সম্পাদক ইসহাক সরকার।
0 comments:
Post a Comment