দুর্নীতির বিচার করতেই হবে; বেগম রোকেয়া বিশ্ববিদ্যালয়

আমাদের দেশের বেসরকারি বিশ্ববিদ্যালয়গুলোর সনদ-বাণিজ্য সুবিদিত হলেও এর কোনো বিহিত ব্যবস্থা দৃশ্যমান নয়। নকল করার জন্য ছাত্রের সাজার ব্যবস্থা থাকলেও বিনা পড়া ও পরীক্ষায় পাসের সনদ দেওয়ার কোনো সাজা নেই। দেশের বিশ্ববিদ্যালয়গুলোর উপাচার্যগণ অনেকটাই সামন্ত প্রভু, যা ইচ্ছা তাই করেন। গণতন্ত্র ও নিয়মনীতির শিক্ষা দিলেও নিজেরা সে পথে হাঁটেন না। আমাদের হাতের কাছে এ রকম কোনো উদাহরণ নেই যে, সরকারি বা বেসরকারি বিশ্ববিদ্যালয়ের কোনো উপাচার্য দুর্নীতির কারণে বরখাস্ত হয়েছেন বা সাজার আওতায় এসেছেন। অপরাধের খবর পড়ি, অব্যাহতির খবর শুনি; কিন্তু বিচার ও সাজার খবর নেই। এসব প্রতিষ্ঠান প্রধানের বিচার হয় না বলেই দুর্নীতিপ্রবণ উপাচার্যগণ দুর্নীতি করতে কুণ্ঠিত নন। ফলে সঙ্গত কারণেই দেশে বিশ্ববিদ্যালয়গুলোতে দুর্নীতির হার বেড়েই চলেছে।

সাবেক উপাচার্য অধ্যাপক ড. মু. আবদুল জলিল মিয়া বিশ্ববিদ্যালয় মঞ্জুরি কমিশনের নিষেধাজ্ঞা উপেক্ষা করে প্রায় চারশ' কর্মকর্তা-কর্মচারী নিয়োগ দিয়েছিলেন। শুধু তাই নয়, তিনি তার মেয়াদ শেষের মাস কয়েক আগে বিধিবহির্ভূতভাবে আরও কিছু নিয়োগ দেওয়ার উদ্যোগ গ্রহণ করলে বিশ্ববিদ্যালয়ের কয়েকজন শিক্ষক বিশ্ববিদ্যালয় মঞ্জুরি কমিশনে লিখিত প্রতিকার চান। বিশ্ববিদ্যালয় মঞ্জুরি কমিশন তখন উপাচার্যকে নিয়োগ বন্ধ রাখার নির্দেশ দেন। নিয়মিত-অ্যাডহক-মাস্টাররোল সব নিয়োগে লিখিত নিষেধাজ্ঞা দেওয়া হয়। কমিশন এ কথাও উল্লেখ করে, যদি নিষেধাজ্ঞার পরও নিয়োগদান অব্যাহত রাখে, তাহলে তার সব দায় উপাচার্যকেই নিতে হবে। তার বিরুদ্ধে রাষ্ট্রপতির নির্দেশে একটি তদন্ত কমিটি গঠিত হয়েছিল। সে তদন্ত কমিটির প্রতিবেদনের ভাষ্য_ পাবলিক বিশ্ববিদ্যালয়ের ইতিহাসে এত দুর্নীতি অন্য কেউ করেছে বলে তদন্ত কমিটির জানা নেই।

নিয়োগে তিনি নীতিমালা ও বিধির তোয়াক্কা করেননি। নিকটাত্মীয় নিয়োগে তিনি নিজেই সভাপতিত্ব করেছিলেন। তিনি সেটাকে অজ্ঞতা বলেছেন, যদিও তদন্ত কমিটি তার অজ্ঞতার অজুহাতকে বিশ্বাস করেনি। তিনি নিজের মেয়ে-ভাই-ভায়রাভাইয়ের ছেলেমেয়ে, স্ত্রীর ভাইয়ের ছেলেমেয়েসহ প্রায় সব ধরনের নিকট আত্মীয়-স্বজনকে নিয়োগ দিয়েছেন। এসব নিয়োগে তিনি কোনো নিয়মকানুন অনুসরণ করেননি। যেমন আপন ভায়রাভাই গাজী মাজহারুল আনোয়ারের নিয়োগ বোর্ডে তারা আপন তিন ভায়রাভাই ছিলেন। দুই ভায়রা পরীক্ষক, এক ভায়রা প্রার্থী। শুধু তাই নয়, সেই ভায়রাভাই গাজী মাজহারুল আনোয়ারকে আবার জ্যেষ্ঠ শিক্ষক আরএম হাফিজুর রহমানকে ডিঙিয়ে বিজ্ঞান অনুষদের ডিনের দায়িত্ব দিয়েছিলেন। এর বিরুদ্ধে আরএম হাফিজুর রহমান বিশ্বদ্যালয় মঞ্জুরি কমিশনে নালিশ করলে এর কিছুটা প্রতিকার আসে, কমিশনের নির্দেশনায় জলিল মিয়ার ভায়রা বাদ পড়েন এবং আরএম হাফিজুর ডিন হন। মু. আবদুল জলিল মিয়া তার আপন ভাইকে চাকরি দিয়েছেন দারুল এহসান নামক কালো তালিকাভুক্ত একটি বিশ্ববিদ্যালয়ের সনদ দেখিয়ে। এটা অজানা নয় যে, বি.কম পাস করার পর সাধারণত ইসলামিক স্টাডিজে মাস্টার্স করা যায় না। অথচ ইসলামিক স্টাডিজে তাকে মাস্টার্স দেখিয়ে হিসাবরক্ষণ কর্মকর্তা পদে নিয়োগ দেওয়া হয়।

উপাচার্য আবদুল জলিল মিয়া বেগম রোকেয়া বিশ্ববিদ্যালয় অধীনে নর্থ বেঙ্গল ইনস্টিটিউট অব ডেভেলপমেন্ট স্টাডিজ নামে একটি পৃথক প্রতিষ্ঠান খুলেছিলেন। যার মালিকানা ছিল তার নিজের ও তার মেয়েসহ নিজস্ব কয়েকজনের। প্রতিষ্ঠানটির আইনগত কোনো ভিত্তি ছিল না। সেটি একটি বাণিজ্যিক প্রতিষ্ঠান হিসেবে গড়ে তোলার চেষ্টা করেছিলেন।

সে সময়ে উপাচার্য ড. মু আবদুল জলিল মিয়ার দুর্নীতি, অনাচার ও নৈরাজ্যের বিরুদ্ধে ওই বিশ্ববিদ্যালয়ের কয়েকজন তরুণ শিক্ষক প্রতিবাদী হয়ে ওঠেন। তাদের সঙ্গে আন্দোলনে শামিল হয় বিশ্ববিদ্যালয়ের ছাত্রসমাজ। একটি ক্ষুদ্র অংশ ছাড়া প্রায় সব শিক্ষার্থী উপাচার্যের বিরুদ্ধে আন্দোলনে শামিল ছিল।

আন্দোলন বানচাল করতে প্রতিবাদী শিক্ষকদের ওপর হামলা করা হয়। শারীরিক নির্যাতনের শিকার শিক্ষক মেডিকেলে ভর্তি হয়ে চিকিৎসা নিতে বাধ্য হয়েছিলেন। বিষয়টি সেখানেই থেমে থাকেনি। প্রতিবাদী শিক্ষকদের আন্দোলন যাতে স্থানীয় ও জাতীয়ভাবে সমর্থন না পায়, সে কারণে তাদের কোনো কোনো নেতৃস্থানীয়দের গায়ে জামায়াতি তকমা দিয়ে পোস্টারিংও করা হয়েছিল। তাতেও যখন পরিস্থিতি উপাচার্যের অনুকূলে আসছিল না, তখন আন্দোলনকারী নেতৃস্থানীয় শিক্ষক আরএম হাফিজুর রহমান, ডক্টর তুহিন ওয়াদুদ, উমর ফারুক, আপেল মাহমুদ এবং কর্মকর্তা আমিনুর রহমান ও মামদুদুর রহমানকে সাময়িক বরখাস্ত করা হয়েছিল। হাইকোর্ট শিক্ষকদের ওই সাময়িক বরখাস্তকে অবৈধ ঘোষণা করেছিলেন।

উপাচার্য মু. আবদুল জলিল মিয়াকে শিক্ষা মন্ত্রণালয় সম্পর্কিত সংসদীয় স্থায়ী কমিটিতে তলব করা হয়েছিল। শিক্ষা মন্ত্রণালয় সম্পর্কিত স্থায়ী কমিটি অবৈধ নিয়োগপ্রাপ্তদের নিয়োগ বাতিল করে উপাচার্যের বিরুদ্ধে ব্যবস্থা নেওয়ার জন্য সুপারিশ করেছিলেন।

উপাচার্য মু. আবদুল জলিল মিয়া বেগম রোকেয়া বিশ্ববিদ্যালয়ের ২০০৯ সালের মে মাসে যোগদান করেন। তার যোগদানের এক বছর হতে না হতেই একটি জাতীয় দৈনিকে খবর হয় বেগম রোকেয়া বিশ্ববিদ্যালয়, যার শিরোনাম ছিল_ 'এটি একটি পারিবারিক বিশ্ববিদ্যালয়'। সরকার মেয়াদ পূরণের আগে যখন তাকে অব্যাহতি দেয়, তখন তার আত্মীয়-স্বজনের সংখ্যা ছিল ৪০-এর বেশি।

উপাচার্য মু. আবদুল জলিল মিয়াকে যখন সরকার অব্যাহতি দেয়, তখন বিশ্ববিদ্যালয়ের ব্যাংক অ্যাকাউন্টে ছিল মাত্র ১৩০ টাকা ১১ পয়সা। অথচ তখন ব্যাংক অ্যাকাউন্টে থাকার কথা ছিল ১০ কোটি টাকার মতো। তিনি শুধু যে সেই টাকা শেষ করেছেন তা নয়, তিনি শিক্ষক-কর্মকর্তা-কর্মচারীদের জিপিএফের টাকাও গায়েব করে গিয়েছিলেন। ফলে সে সময় বিশ্ববিদ্যালয়টি দেনাগ্রস্ত হয়ে পড়েছিল।

উপাচার্য মু. আবদুল জলিল মিয়ার দুর্নীতির প্রতিকার চেয়ে বিশ্ববিদ্যালয় শিক্ষক আরএম হাফিজুর রহমান দুদকে লিখিত আবেদন করেন। তার আবেদনের পর দুদক রংপুর মু. আবদুল জলিল মিয়ার দুর্নীতি তদন্ত করে প্রাথমিকভাবে প্রমাণ পেয়ে ১২.১২.২০১৩ সালে দুর্নীতি প্রতিরোধ আইনে রংপুর কোতোয়ালি থানায় মামলা দায়ের করেন। দুদক এজাহারে মু. আবদুল জলিল মিয়া, সাবেক রেজিস্ট্রার শাহজাহান আলী মণ্ডল, উপ-পরিচালক এটিজিএস গোলাম ফিরোজ, সহকারী পরীক্ষা নিয়ন্ত্রক ফিরোজুল ইসলাম, সহকারী রেজিস্ট্রার মোরশেদ উল আলম রনি, সহকারী পরিচালক (অর্থ ও হিসাব) খন্দকার আশরাফুল আলম, সহকারী পরিচালক রেজাউল করিম শাহ, সেকশন অফিসার গ্রেড-২ মুনিরা বেগমসহ বেশ কয়েকজনের অনিয়ম উল্লেখ করেছে।

এজাহার দাখিলের তিন বছর পেরিয়ে গেলেও এখন পর্যন্ত দুর্নীতিবাজরা বিচারের মুখোমুখি হননি। তদন্ত শেষে তদন্তকারী কর্মকর্তা চার্জশিট দাখিল করলেও তা এখন পর্যন্ত আদালতে পেঁৗছায়নি। আসামির ব্যক্তিগত ওজর-আপত্তির কারণে নাকি কমিশনে শুনানির অপেক্ষায় আছে। নিশ্চয়ই কমিশন বিষয়টির দ্রুত নিষ্পত্তি টানবে। বেগম রোকেয়া বিশ্ববিদ্যালয় এবং রংপুর বিভাগ উত্তর জনপদের মানুষের লম্বা সংগ্রামের ফসল। প্রতিষ্ঠানটি ব্যক্তির দুর্নীতির কাছে যাতে বিনষ্ট না হয় সে কারণে প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা উপাচার্যকে অপসারণ করে তার অবস্থানকে স্পষ্ট করেছেন।

অন্য মামলা থেকে দুর্নীতির মামলার পার্থক্য একটি জায়গায় সেটি হচ্ছে, এ মামলাটি এজাহার দাযেরের আগে একবার তদন্ত হয় এবং এজাহারের পরে আরেকবার তদন্ত হয়। তদন্তে প্রমাণ মিললে অভিযোগপত্র দাখিল হয়। সাবেক উপাচার্য জলিল মিয়ার কর্ম দেখে এ কথা স্পষ্ট, তিনি শিক্ষা বিস্তারে রংপুরে আসেননি, এসেছিলেন ব্রিটিশ বেনিয়াদের মতো বাণিজ্য করতে।

মু. আবদুল জলিল মিয়া ভয়াবহ মাত্রার দুর্নীতি করেছেন_ সেটি তার ঘনিষ্ঠরাও বলেন। একটি শিশু বিশ্ববিদ্যালয়কে তিনি পারিবারিক এবং বাণিজ্যিক প্রতিষ্ঠানে পরিণত করেছিলেন। এত বড় অপরাধ করার পরও যদি তার বিচার না হয়, বিচারে শাস্তি না হয়, তাহলে দুর্নীতিকেই উৎসাহিত করা হবে। নিশ্চয়ই বিশ্বাস আছে, স্বাধীন দুর্নীতি দমন কমিশন বিচার বিলম্বিত করার কোনো কূটকৌশলের কাছে ধরাশায়ী হবে না।

সাবেক সিনেটর, রাজশাহী বিশ্ববিদ্যালয়; সদস্য একাডেমিক কাউন্সিল, জাতীয় বিশ্ববিদ্যালয়।
Share on Google Plus

About WARAJ

    Blogger Comment
    Facebook Comment

0 comments:

Post a Comment